দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের নানা প্রশ্ন | অজানা রাশিকে X ধরা হয় কেন | মেয়েরা লিপস্টিক পরে কেন | কোন চিনি ভালো বেশি | Science dojo

Science Dojo
By -
0


মস্তিষ্ক কি আপনাকে ফাঁকি দেয়?

অনেক সময় ফাঁকি দেয়, তবে জেনেশুনেই দেয়। উদ্দেশ্য মহৎ। যেন আপনি সহজে একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারেন। যেমন, আপনি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। একজন বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা শুরু করল। প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে চটপট। আচ্ছা বলো তো, বইমেলায় একটা বই ও একটা কলমের দাম ২১২ টাকা। বইয়ের দাম কলমের দামের চেয়ে ২০০ টাকা বেশি। কোনটার দাম কত? আপনার ব্রেইন অর্থৎ মস্তিষ্ক এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে রাজি না, কারণ সবার আগে বলতে না পারলে তো মান থাকে না। তাই চট করে মস্তিষ্ক আপনার মুখে উত্তরটা এগিয়ে দিল, বইয়ের দাম ২০০ টাকা ও কলমের দাম ১২ টাকা! খুব সোজা, তাই না? কিন্তু আপনার উত্তরটা ভুল । আসলে কলমের দাম ছয় টাকা ও বইয়ের দাম ২০৬ টাকা, দুয়ে মিলে ২১২ টাকা। বইয়ের দাম ২০৬ টাকা হলেই কেবল তার থেকে কলমের দাম ছয় টাকা বাদ দিলে থাকবে ২০০ টাকা। মিলিয়ে দেখুন হিসাবটা। দুয়ের দামের পার্থক্য হতে হবে ২০০ টাকা। প্রথমে যে উত্তরটা চট করে এসে গিয়েছিল, সেখানে বই ও কলমের দামের পার্থক্য ২০০ টাকা ছিল না, ছিল ১৮৮ টাকা। মস্তিষ্ক কিন্তু বুঝেশুনেই আপনার মঙ্গলের জন্য আপনাকে ফাঁকি দিয়েছে। কারণ, সহজে কেউ এই ভুলটা ধরতে পারবে না, আর আপনিও ফার্স্ট হয়ে যাবেন। যদি পরীক্ষার হলে গণিতের প্রশ্ন হতো, তাহলে মস্তিষ্ক ভেবেচিন্তে, সময় নিয়ে আপনাকে সঠিক উত্তরটা বলে দিত।

কাচ স্বচ্ছ কেন?

আলো আসলে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় শক্তি-তরঙ্গের মতো। এই তরঙ্গ কোনো বস্তুর ভেতর দিয়ে যদি অবাধে অতিক্রম করতে পারে, তাহলেই সেটা স্বচ্ছ। কাচ এ রকম পদার্থ। কিন্তু কাঠ বা টিনের পাত সেরকম নয়, তাই ওগুলো অস্বচ্ছ পদার্থ। এখন প্রশ্ন হলো, কোনো কোনো বস্তু কেন তার মধ্য দিয়ে আলোক তরঙ্গ অতিক্রম করতে দেয় আর কোনো বস্তু কেন দেয় না। এটা নির্ভর করে বস্তুর ইলেকট্রন বিন্যাসের ওপর। কোনো পদার্থের ভেতর ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো আছে এবং পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে তাদের বন্ধন কী রকম, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। বিশেষভাবে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ কোনো বস্তুর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করার সময় বস্তুর প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করে এর ওপর । যদি ইলেকট্রনগুলো ওই তরঙ্গের শক্তি শুষে নিতে না পারে, তাহলে ওই পদার্থের মধ্য দিয়ে আলো নির্বিবাদে চলে যায় এবং বস্তুটি স্বচ্ছ বলে প্রতিভাত হয়। আর যদি ওরা কিছু পরিমাণ অথবা পুরো তরঙ্গশক্তি আত্মসাৎ করতে পারে, তাহলে বস্তুটি কিছুটা ম্লান, আবছা অথবা পুরোপুরি ঘন দেখায়। এগুলোই অস্বচ্ছ। ইট, পাথর, লোহা প্রভৃতি এ রকম বস্তু ।

সাদা চিনির চেয়ে কি ধূসর চিনি ভালো?

আসলে এমন কোনো চিনি নেই যেটা অন্যটার চেয়ে ভালো। অনেক সময় ধারণা দেওয়া হয় যে ধূসর চিনি যেহেতু বেশি পরিশোধন করা হয় না, সে কারণে ওই চিনিতে প্রাকৃতিক গুণ বেশি থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ধূসর, লালচে রঙের বা সাদা চিনি—সব কটিতেই প্রায় একই ধরনের পুষ্টি থাকে । তবে লাল গুড় কিছুটা ভালো; কারণ, গুড়ে লোহা (আয়রন) বেশি থাকে। অনেক সময় সাদা চিনিতে কিছু রং মিশিয়ে ধূসর চিনি তৈরি করা হয়, যেহেতু এর চাহিদা বেশি। সেদিক থেকে বলা চলে, সাদা বা ধূসর চিনি আসলে একই বস্তু। অনেক চিকিৎসক বলেন, চিনি হলো 'সাদা বিষ'! কারণ, আমরা যে খাবার খাই তা শরীরের চিনির চাহিদা পূরণ করে। খাদ্য পরিপাক করে শরীর যা গ্রহণ করে সেটাই আসলে চিনি, যা আমাদের কাজ করার শক্তি দেয়। সেই সঙ্গে শরীর পায় খাদ্যে সঞ্চিত ভিটামিন, বিভিন্ন ধরনের লবণ ও খনিজ পদার্থ। সরাসরি চিনি খেলে শরীর শুধু চিনিই পায়। প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত চিনি শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সেটা এক অর্থে বিষই বটে। যাঁদের মোটামুটি ভাত-ডাল-মাছ খেয়ে চলার সংগতি আছে এবং সেই খাবার খেয়েই দৈহিক শ্রমের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি দেহে সঞ্চিত হয়, তাঁদের বাড়তি চিনি খাওয়ার প্রয়োজনই নেই। এর পরও কোনো খাবার মিষ্টি করতে হলে চিনির চেয়ে লাল গুড় ব্যবহার করা ভালো।


অজানা রাশিকে x ধরি কেন?

কয়েক দিন আগে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আমাদের কয়েকজনের কাছে একটি ইউ টিউবের ভিডিও ক্লিপিং ফরোয়ার্ড করেন। সেখানে টেরি মুর ব্যাখ্যা করছেন, কেন অজানা রাশিকে x ধরা হয়। এখন তো x বহুল প্রচলিত, সবাই ব্যবহার করেন। যেমন, X ফাইল.. x গ্রহ। বীজগণিতে কোনো অজানা রাশির মান বের করতে হলে প্রথমে ধরে নিই তার মান X । কেন x ধরি? এটা এসেছে আরবি ভাষা থেকে রূপান্তরিত হয়ে। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে আরবরা বিজ্ঞান ও গণিতে অনেক উন্নতি করে। বিশেষভাবে বীজগণিতে। আরবি আলজাবর থেকে অ্যালজেবরা এসেছে। এই সময় বীজগণিতের বিষয়গুলো ইউরোপীয় তথা স্পেনীয় ভাষায় অনুবাদের উদ্যোগ নেন অনেকে। কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দেয়। আরবি ভাষায় 'শিন' অক্ষরটি যেভাবে বাংলায় 'শ' বা ইংরেজিতে 'sh' দিয়ে উচ্চারণ করা যায়, স্পেনীয় ভাষায় সে রকম পারা যায় না। অনুবাদ করতে গিয়ে এখানে স্পেনীয়রা এই সমস্যায় পড়েন। আরবিতে 'শাইউন' শব্দের অর্থ 'কিছু' আর 'আল-শাইউ' (আশ্শাইউ) শব্দের অর্থ ‘কোনো কিছু' অর্থাৎ অজানা কিছু। ‘বর্গমূল নির্ণয়' বিষয়ক লেখায় 'আল- শাইউ' শব্দের অনুবাদ করার সময় দেখা গেল স্পেনীয় ভাষায় 'শ' নেই। তাই সেখানে। স্পেনীয় বিজ্ঞানীরা প্রাচীন গ্রিক অক্ষর X কাই' ব্যবহার করেন। এটা দেখতে ইরেজি x-এর মতো বলে পরে ইংরেজিতে কাইয়ের পরিবর্তে অজানা রাশি বোঝাতে x-এর প্রচলন হয়।

মেয়েরা লিপস্টিক পরে কেন?

এ ব্যাপারে বিভিন্ন তত্ত্ব আছে। প্রধান তত্ত্বটি হলো নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলা। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক বন্ধুদের কাছে টানে। মন দেওয়া-নেওয়া যদি প্রেমের প্রথম পর্ব হয়, দ্বিতীয় পর্ব হলো চুম্বন ৷ চুম্বনে মেয়েদের ঠোঁট রাঙা হয়। লিপস্টিক তারই প্রতীক। কিশোরীদের ঠোঁটের স্বাভাবিক রং কিছুটা রক্তিম। তাই তরুণী বা বয়স্করা লিপস্টিক পরে ঠোঁট রঙিন করলে বয়স কম দেখায়। এ কারণেও মেয়েরা লিপস্টিক পরে। এ সবই সত্য। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসার মধ্যেই লিপস্টিকের মাহাত্ম সীমিত নয়। লিপস্টিক মেয়েদের ব্যক্তিত্বকেও ফুটিয়ে তোলে। এর একটা ইতিহাস আছে। ১৮৯০ ও ১৯০০-এর দশকে মেয়েদের ভোটাধিকার অর্জনের আন্দোলনের সময় ইউরোপ-আমেরিকায় মেয়েরা প্রচলিত ধারার বিরোধিতার প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে লিপস্টিক পরা শুরু করে। ১৯৮০-এর দশকে বড় বড় কোম্পানির উচ্চতর পদে অগ্রাধিকার আদায়ের সংগ্রামে মেয়েরা লিপস্টিক পরাকে তাদের একটি অন্যতম অস্ত্র হিসেবে গণ্য করতে থাকে। এটা লিপস্টিক পরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নারীর ক্ষমতায়নে লিপস্টিকের ভূমিকা রয়েছে। শুধু মেয়েদের সৌন্দার্যের প্রতীকই নয়, লিপস্টিক মেয়েদের ব্যক্তিত্বেরও প্রকাশ ।


একজন তরুণী কখন লাজে রাঙা হয়?

মনে করুন সেই দিনটির কথা, যখন সব জড়তা কাটিয়ে আপনি প্রেম নিবেদন করলেন। ভালোবাসার মানুষটির লজ্জাবনত মুখ লাল হয়ে উঠল, আর আপনি ঘামতে শুরু করলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লে চোখ-মুখ লাল হয়ে যায়। কারণ, বিব্রতকর অবস্থা সামাল দিতে রক্ত সরবরাহ বেড়ে যায়। তখন মুখ ও শরীরের অন্যান্য অংশের রক্তবাহী ধমনি প্রসারিত হয়। মুখমণ্ডলে তার ছাপ পড়ে। এ জন্য লাল দেখায়। একে ইংরেজিতে বলে 'রাশিং' যাকে সাদা বাংলায় বলা হয় লাজে রাঙা' হওয়া। বাড়তি রক্তপ্রবাহের কারণে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ে। এই খবর চামড়ার স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এর প্রতিক্রিয়ায় যেমন চোখমুখ গরম হয়ে ওঠে, তেমনি ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অবস্থা হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আবেগ-অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল আয়ত্ত করে নেয়। তাই লাজে রাঙার ব্যাপারটা সাধারণত তরুণ-তরুণীদের বেলায়ই দেখা যায়।

বিঃদ্রঃ উপরের তথ্যগুলো বিজ্ঞানের রাজ্যে শত প্রশ্ন  বই থেকে নেওয়া। (পর্ব ২)  প্রথম পর্ব

সংগ্রহীতঃ বই: বিজ্ঞানের রাজ্যে শত প্রশ্ন।

লেখক: আব্দুল কাইয়ুম 

প্রকাশকাল: ২০১৩

সর্বশেষ প্রকাশ: ২০১৯


পরবর্তী আর্টিকেলে যা থাকছে-

☞ মেয়েশিশুরা কেন গোলাপী জামা পরে?

☞ প্রথম দেখার স্মৃতি ভোলা যায় না কেন?

☞ চুম্বনে চোখ বন্ধ হয়ে আসে কেন?

☞ ইন্টারনেটে বিয়েতে প্রেম কতটা টেকসই?


Post a Comment

0Comments

Thanks for comment.....!

Post a Comment (0)